কমিউনিকেশন ক্রাইসিস কাটানোর উপায়
আজকের দুনিয়ায় সঠিক পদ্ধতিতে কমিউনিকেশনের অভাব সর্বত্রই চোখে পড়ছে। ফলে বাড়ছে দূরত্ব। তবে সমস্যা যতই গুরুতর হোক না কেন, সমাধান আপনার হাতের মুঠোয়।
কর্পোরেট দুনিয়ার সমস্যায় জেরবার? অনেক খুঁজেও সমাধান পাচ্ছেন না। চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখুন তো, ব্যাপারটা কমিউনিকেশন ক্রাইসিস কিনা! হ্যাঁ, তাই। তা হলে এবার দেখুন, নিজের কথা বলায়, নিজেকে মেলে ধরায় আদৌ কোনও অসঙ্গতি চোখে পড়ছে? এদিকে আবার বিদ্যে-বুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত বিচক্ষণতার অভাবে আপনার সহকর্মীটি আপনাকে দিব্যি টেক্কা দিয়ে চলছে। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, এসবই ঘটছে সঠিক কমিউনিকেশনের অভাবে, যা কমবেশি আমাদের সবাইকেই আজ ঘিরে ধরেছে। বিশেষত বিপিও আর এমএনসি-র কালচারে কেতাদুরস্ত হয়ে ওঠার স্বপ্নে বিভোর কম বয়সিদের মধ্যে এই সমস্যা খুবই। কমিউনিকেশন, বডি ল্যাঙ্গোয়েজ আর মেন্টালিটি- এই তিনটির মধ্যে যদি সঠিক ভারসাম্য রাখা না যায়, তবে বাড়তেই থাকে সমস্যা। আজকের কর্পোরেট দুনিয়ায় পজিশন বজায় রাখা যখন এতই কঠিন, আমি এখন কী-তা বিচার না করে, ভবিষ্যতে আমি কতটা ‘ফ্লেক্সিবল’ হতে পারব- তার ওপর নির্ভর করছে, তখন আপনাকে প্রথমেই বাড়াতে হবে কমিউনিকেশন। দু’জন মানুষের মধ্যে কমিউনিকেশন ক্রাইসিস অনেকটা দূরত্ব তৈরী করলেও এর সমস্যা সমাধানের পথ কিন্তু মোটেও হাতের বাইরে না। কাউন্সেলার আর স্পিচ থেরাপিস্টের কাছে ভিড় না বাড়িয়ে একটু ভাবলেই এর সমাধান পাওয়া যাবে।
প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের জীবনে যেসব সমস্যা আছে তার মধ্যে এই কমিউনিকেশন সমস্যাকে মোটেই খাটো করে দেখা চলবে না। সমস্যা কাটাতে প্রথমেই বাড়াতে হবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ। কমিউনিকেশন ক্রাইসিস নানা ধরণের হতে পারে। কারও তাড়াতাড়ি কথা বলার সমস্যা, আবার কেউ কথা শুরু করলে আর থামতেই চায় না, কারওর বসকে ফেস করতে সমস্যা, আবার কারওর বডি ল্যাঙ্গোয়েজ দেখে বস তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠছেন। সুতরাং সমস্যাটা শুধু কমিউনিকেশন সমস্যাতেই আটকে নেই, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ব্যক্তিত্বের বিকাশ।
দ্রুত কথা বলার সমস্যা :
কমিউনিকেশন সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে দ্রুত কথা বলার সমস্যা। কখনও বেশিমাত্রায় স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে আবার কখনও বা অতিরিক্ত টেনশনে, আবার কারওর ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই এই সমস্যা দেখা যায়। ফলে চড়তে থাকে সমস্যার পারদ। কথার স্পিড বাড়িয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বক্তব্য পেশ করার মানসিকতা নিয়ে যাঁরা চলেন, কর্পোরেট লাইফে তাঁদের জন্য কিন্তু প্রচুর সমস্যা অপেক্ষা করে থাকে। কেউ হয়তো আপনার বক্তব্য পুরোটা বুঝলনা, কেউ হয়তো বিরক্তিতে পরবর্তীকালে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেই চাইল না। বিশেষত, অর্থ উপদেষ্টাদের যদি এধরণের কমিউনিকেশনের সমস্যা হয়, তা হলে তো পুরো কাজটাই চলে যাবে বিশ বাঁও জলে!
তবে সমস্যার সমাধানও তো আছে। একটা ক্যাসেটে নিজের কথা রেকর্ড করে যদি বারবার শোনা যায়, তবে অবধারিতভাবেই ধরা পড়বে নিজের ভুল-ক্রটি। বদলাতে হবে নিজের কথা বলার ধরণ, স্পষ্ট করতে হবে উচ্চারণ, কোনও শব্দে জড়তা থাকলে তা খুঁজতে হবে, আর এর সঙ্গে বদলাতে হবে নিজের পুরনো অভ্যেস।
বেশি কথা বলার সমস্যা :
কমিউকেশন ক্রাইসিসের সবচেয়ে মারাত্মক পর্যায় এটি। অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রফেশনাল লেভেল থেকে কথা শুরু করে ব্যাপারটা রাজনীতি-ক্রিকেট-ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ঘুরে গিয়ে থামে একেবারে পার্সোনাল লেভেলে। কিছুক্ষণ ভাল লাগলেও ক্রমশই বোর হতে থাকবেন আপনার সামনে থাকা মানুষটি। মুখে কিছু না বললেও, কিছুদিন পর থেকেই দেখবেন, তিনি আপনাকে এড়িয়ে চলছেন।
তবে সমস্যাটা বিরক্তিকর হলেও সমাধান কিন্তু হাতের বাইরে নয়। কথা বলার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে জবে, অপ্রাসঙ্গিক তথ্য কেউই পছন্দ করেন না। তাই ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তি বা অযৌক্তিক বক্তব্য সম্পর্কে সাবধান হতে হবে। আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ঝুলি এবং নিজের জ্ঞানভাণ্ডারকে দূরে সরিয়ে রেখে স্বল্প বক্তব্যে গুছিয়ে প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলতে থাকুন।
বস বা গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলার সমস্যা :
‘বস’ শব্দটির সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে একটা অহেতুক ভীতি। ফলে কমিউনিকেশন ক্রাইসিস যে এখানে মাত্রাতিরিক্ত হয়ে উঠবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ধরা যাক, কোনও আলোচনা সভায় আপনার কোম্পানির চেয়ারম্যানের শুভেচ্ছা বিনিময়ের মুহূর্তে অথবা বিশেষ কোনও গ্রাহকের সঙ্গে করমর্দনের সময় লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আপনি সঠিক সময়ের মধ্যে কথার উত্তর দিতে পারলেন না। কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গিয়ে অজানা কোনও ভয় আপনাকে ঘিরে ধরল। ব্যস, সঙ্গে-সঙ্গে চিত্তির! তিনি ততক্ষণে চলে গেছেন পাশে দাঁড়ানো আপনার সহকর্মীটির কাছে।
এবার ভাবছেন কী করবেন? মাথার মধ্যে এসে যাচ্ছে হাজারও চিন্তা ঘাবড়াবেন না। সময় থাকলে এই ধরনের কোনও অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে আপনি ভেবে নিন, ঠিক কী কী বলতে হবে। আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকবার প্র্যাকটিস করে নিলে তো আর কথাই নেই। তবে হাতে সময় পাওয়া একটা বড় সমস্যা। সেক্ষেত্রে মনে-মনে দৃশ্যকল্পনা করে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথোপকথনের একটা কাল্পনিক চিত্র তৈরি করতে থাকুন। মিটিং- এ যাওয়ার আগে দেখে নিন, ফাইল থেকে শুরু করে ল্যাপটপ, যাবতীয় দরকারি কাগজপত্র সব কিছু ঠিক আছে কি না। আর সবার আগে নিজের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে থাকুন। আপনি নিজেকে কতটিা, কীভাবে প্রেজেন্ট করবেন। তবে আত্মবিশ্লেষণ যেন কখনওই আত্মঅহংকারের পর্যায়ে পৌঁছে না যায় অথবা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা ইগোর সমস্যা যেন তৈরী না করে।
বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরী ভাষার সমস্যা :
একটি প্রাইভেট কোম্পানির এক পিএ তাঁর বসের কাছে বকুনি খেয়েছিলেন। তাঁর অপরাধ ছিল গুরুত্বপূর্ণ মিটিং- এর সময় মাথার ক্লিপ নিয়ে অতিরিক্ত নাড়াচাড়া করা। হ্যাঁ ঠিকই, কমিউনিকেশন ক্রাইসিসে বডি ল্যাঙ্গুয়েজও একটা বড় ভূমিকা নেয়। অশালীন বা অস্বাভাবিক বডি ল্যাঙ্গোয়েজ কারও কাছেই অভিপ্রেত নয়। অনেক সময় দেখ যায়, কথা বলার সময় কেউ কেউ খুব বেশি ছটফট করছেন, অযথা মাটিতে পা ঘষছেন, অকারণে কেউ হয়তো বা অ্যাক্সেসরিজের দিকে বেশি নজর দিচ্ছেন, আর অচিরেই আপনার মন সরে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে!
এর সমাধান কিন্তু আপনার নিজের হাতে। অন্তত খানিকক্ষণের জন্য নিজের স্বভাব পালটান। অহেতুক বডি ল্যাঙ্গেয়েজ বন্ধ করুন। ঠিকঠাক কথাবার্তার দিকে মন দিন। নিজের উত্তেজনার বা আবেগের প্রকাশ কখনওই বডি ল্যাঙ্গোয়েজে থাকা উচিত নয়। যদি কথা বলার সময় নিজেকে সংযত করতে না পারেন, তা হলে কমিউনিকেট করার আগে কিছুটা সময় নিয়ে নিন।
প্রথম ইমেপ্রশন মানুষের মনে গভীরভাবে ছাপ পড়ে। তাই এমন কোনও বডি ল্যাঙ্গোয়েজ প্রকাশ পাবে না যা প্রথমেই নেগেটিভ ইমেপ্রশন তৈরি করে দেয়।
ব্যবহার সংযত করুন:
অযথা অন্যের মধ্যে কথা বলা বা কারওর কাজের ধরণ নিয়ে হুটহাট কোনও মন্তব্য করা আকছারই দেখা যায় কপোরেট দুনিয়ায়। অথবা কথা বলার সময় অনেকে এমন রূঢ়ভাবে কথা বলেন, যার ফলে অন্যেরা অসন্তষ্ট হন।
এমন সমস্যা হলে সহকর্মীর সঙ্গে মন খুলে সরাসরি কথা বলুন। সমস্যা শুধু বাইরের দুনিয়ায় চলতে গেলেই নয়, সমস্যা আছে ব্যক্তিগত জীবনেও। তাই কমিউনিকেশন ক্রাইসিস কে শুধু কর্পোরেট পরিস্থিতে বিচার করলেই চলবে না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ব্যক্তিগত জীবনে কথা বলার জড়তা, অস্পষ্টতা জাতীয় সমস্যাগুলোকে শুধরে দেওয়া হয় না বলেই পরবর্তীকালে সমস্যাগুলো তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে। প্রত্যেক ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে চাকরি জীবনে বস, সহকর্মী থেকে শুরু করে আপনার থেকে অধস্তন কর্মীটির সঙ্গেও যোগাযোগ গড়ে তুলুন। সময়, পরিস্থিতির সঙ্গে অবস্থার গুরুত্ব বুঝে কথা শুরুন, নিজস্ব ছন্দে কথা বলুন। যোগাযোগের সমস্যা, ঠিকমতো কথা বলা, আদব-কায়দার সমস্যা থাকবেই। জীবনে চলতে গেলে প্রতিটি পরিবেশেই হয়তো নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হবে। তবে ভয় না পেয়ে, তাকে দূরে সরিয়ে না রেখে যুক্তি দিয়ে যাচাই করে মানিয়ে চলুন। কারণ, আজকের কর্পোরেট দুনিয়ায় পিআরও না হয়েও যাঁরা পাবলিক রিলেশনে বা জনসংযোগে সিদ্ধহস্ত, ভবিষ্যতে উন্নতির জাদুদণ্ড তো তাঁদেরই হাতে।